সোমবার, ২২ Jul ২০২৪, ০৪:১০ পূর্বাহ্ন

        English
শিরোনাম :
চট্টগ্রামস্থ ছাগলনাইয়া সমিতির আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল বিশেষ অভিযানে ৬ গ্যাংয়ের ৩৩ জন আটক, দেশী অস্ত্র উদ্ধার ভালো আছেন খালেদা জিয়া ঈদকে ঘিরে জাল নোট গছিয়ে দিত ওরা কুতুব‌দিয়ায় নতুন জামা পেল ১৩৫ এতিম ছাত্র-ছাত্রী মানিকছড়িতে গণ ইফতার মাহফিল সীতাকুণ্ডে লরি চাপায় পথচারী যুবক নিহত সীতাকুণ্ডে পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু রামগড়ে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে বিজিবির পুরস্কার ও সনদ বিতরন লাইসেন্স বিহীন ফিলিং স্টেশন স্থাপন করে কার্ভাড ভ্যানে চলছে অবৈধ গ্যাস বিক্রি কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক বিশেষ ক্যাম্পেইন জিম্মি নাবিকদের উদ্ধারে জাহাজের মালিকপক্ষের নতুন ঘোষণা
প্রথম দফায় হিন্দু-মুসলিম নয় কেন!

প্রথম দফায় হিন্দু-মুসলিম নয় কেন!

♦ রেজানুর রহমান

কেন রে ভাই, প্রথমে শুধু হিন্দু রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলছেন কেন? হিন্দু-মুসলমান সবাইকে তো একসঙ্গে দেশ থেকে তাড়িয়েছেন। শুধু তাড়াননি, তাদের ওপর ইতিহাসের নির্দয়, নিষ্ঠুরতম অত্যাচারও করেছেন। খুন, ধর্ষণ করার সময় তো একবারও ভাবেননি কে হিন্দু, কে মুসলমান? এখন বলছেন, প্রথম দফায় ৪৫০ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবেন। শুধু হিন্দু রোহিঙ্গারা কেন? হিন্দু-মুসলমান মিলে ফেরত নেওয়ার কথা বলছেন না কেন? নাকি এক্ষেত্রে কোনও দুরভিসন্ধি কাজ করছে? হিন্দু রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে ভারতকে বোঝাতে চান–ভাই, আমরা হিন্দুদের ফেরত নিয়েছি। এবার আপনারা আর কিছু বলবেন না, প্লিজ। দেখি বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গে কী করে!
আমার এক বন্ধু এভাবেই রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে হঠাৎ তর্ক শুরু করে দিলেন। দেশের অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত খবর প্রকাশিত হয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিক শিরোনাম করেছে ‘প্রথমে ৪৫০ রোহিঙ্গা হিন্দুকে ফেরত নিতে চায় মিয়ানমার। আরেকটি দৈনিকের শিরোনাম–‘রোহিঙ্গাদের ফেরাতে প্রস্তুতি সম্পন্ন। প্রথম ধাপে হিন্দু শরণার্থীদের নেবে মিয়ানমার’। পত্রিকাগুলোর শিরোনাম দেখেই বন্ধু ক্ষুব্ধ। বার বার তিনি একটি কথাই বলছিলেন–ওরা কি অত্যাচার করার সময় হিন্দু-মুসলামান বিবেচনায় নিয়ে করেছিল? ফেরত নেওয়ার সময় প্রথমে কেন শুধুই হিন্দুদের কথাই বলছে?

বন্ধুকে বললাম, এত তর্ক করছেন কেন? মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে রাজি হয়েছে, এটাই তো বড় খবর। মুসলমান আগে যাবে নাকি হিন্দু আগে যাবে, এটা নিয়ে এত কথার কী আছে? দেশের মানুষ দেশে ফেরত যাচ্ছে এটাই তো বড় কথা! বন্ধু কী বুঝলেন, জানি না। তবে আমার কথায় তিনি আশ্বস্ত হতে পারেননি, এটা বুঝতে পারলাম। সে চলে যাওয়ার পর আমার মনের ভেতর বন্ধুর কথাটাই উঁকিঝুঁকি দিতে থাকলো। মিয়ানমার দেশটিকে আদৌ বিশ্বাস করা যায়? অথচ একটা সময় আমাদের দেশের মানুষের কাছে মিয়ানমার অর্থাৎ বার্মা ছিল অনেক প্রিয় দেশ। বার্মা যাচ্ছি–অর্থাৎ বন্ধুর বাড়িতে যাচ্ছি। এমনটাই ছিল দুই দেশের মানুষের মাঝে সম্পর্কের মধুরতা। মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী অং সান সু চি যেন এই দেশেরই প্রিয় নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। সু চির প্রতি যখন ওই দেশে অবিচার হয়েছে তখন আমাদের দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে, কষ্টও পেয়েছে। সেই মিয়ানমার কেমন করে বদলে গেলো? মিয়ানমারের কোনও মানুষ অন্য মানুষকে অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে নির্বিচারে হত্যা করতে পারে; এটা ছিল কল্পনারও বাইরে। সেই মিয়ানমারে ইতিহাসের নির্দয় নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ড হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে তাদের দেশছাড়া করা হয়েছে। কিছুদিন আগেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সে দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ মেনে নেয়নি। পরে বাংলাদেশের দৃঢ় পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা কিছুটা নমনীয় হয়। যদিও যে সময়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা বলা হচ্ছে সেই সময়েও প্রতিদিন বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসছে। একদিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আবার অন্য দিকে রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। পাশাপাশি আবার বলা হচ্ছে প্রথমে শুধু হিন্দু রোহিঙ্গারাই মিয়ানমারে ফেরত যাবে। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে এক ধরনের সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। এটা তো সহজ সরল অংকের মতো পরিষ্কার–আপনি যখন কোনও সংকট মোকাবিলা করতে চাইবেন, তখন সংকটের উৎসমুখ আগে বন্ধ করবেন। ধরা যাক, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। তাহলে প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গারা আর যেন বাংলাদেশে না আসে। বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গারা প্রতিদিন বাংলাদেশে আসতেই থাকল। সেদিকে নজর না দিয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যদি বলে আমরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিচ্ছি। সেটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য হবে? আবার যদি শর্তজুড়ে দেওয়া হয় প্রথমে শুধু হিন্দু রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে, তাহলে তো সন্দেহ থেকেই যায়। কেন প্রথম দফায় শুধু হিন্দু রোহিঙ্গা মিয়ানমারে যাবে? হিন্দু, মুসলমান মিলে নয় কেন? এটি তো খুবই যৌক্তিক প্রশ্ন!

এছাড়া আরও অনেক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর প্রয়োজন? রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ফেরত যাবে। কিন্তু তারা কি তাদের বাড়ি-ঘর, বসতভিটা ফেরত পাবে? তারা মিয়ানমারে ফেরত গিয়ে উঠবে কোথায়? রোহিঙ্গাদের ফেরত নিয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ নতুন করে তাদের ওপর অত্যাচার চালাবে না তো? এছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার পদ্ধতি কী হবে? তারা কিভাবে, কোন পথে, কোন বাহনে চড়ে মিয়ানমারে ফেরত যাবে, এই ধরনের নানা প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর প্রয়োজন।

এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ডেপুটি হাইকমিশনার কেট গিলমোর রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমঝোতার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সেখানে ফেরত পাঠানোর আগে দেখা দরকার যে, ফেরত গিয়ে তারা আবার সহিংসতা-নির্যাতনের শিকার হবে কিনা।

কেট গিলমোরের এই বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে যা যা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তা কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করবে তলিয়ে দেখা খুবই জরুরি। একটা ছোট্ট গল্পের মাধ্যমে লেখাটি শেষ করতে চাই। গৃহ পরিচারিকাকে নির্যাতন করেছে এক দম্পতি। অসহায় মেয়েটি পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় পাশের ফ্ল্যাটে। সেই দম্পতির বিরুদ্ধে গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। সেই দম্পতি প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করতে চাইলেও ফ্ল্যাট মালিক সমিতির নজরদারির কারণে দোষ স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ও উভয় পক্ষের সমঝোতায় মেয়েটিকে আবার সেই দম্পতির বাসায় পাঠানো হয়। তারপর থেকে মেয়েটির আর কোনও খোঁজ নেই।

বালাইষাট। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের ভাগ্যে যেন এমন কিছু না হয়, তারা যেন স্বসম্মানে মিয়ানমারে ফেরত যেতে পারে, এটাই হোক আমাদের সমবেত প্রার্থনা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, পরিচালক, সম্পাদক আনন্দ আলো

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT