বুধবার, ১৭ Jul ২০২৪, ১০:০৮ অপরাহ্ন

        English
শিরোনাম :
চট্টগ্রামস্থ ছাগলনাইয়া সমিতির আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল বিশেষ অভিযানে ৬ গ্যাংয়ের ৩৩ জন আটক, দেশী অস্ত্র উদ্ধার ভালো আছেন খালেদা জিয়া ঈদকে ঘিরে জাল নোট গছিয়ে দিত ওরা কুতুব‌দিয়ায় নতুন জামা পেল ১৩৫ এতিম ছাত্র-ছাত্রী মানিকছড়িতে গণ ইফতার মাহফিল সীতাকুণ্ডে লরি চাপায় পথচারী যুবক নিহত সীতাকুণ্ডে পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু রামগড়ে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে বিজিবির পুরস্কার ও সনদ বিতরন লাইসেন্স বিহীন ফিলিং স্টেশন স্থাপন করে কার্ভাড ভ্যানে চলছে অবৈধ গ্যাস বিক্রি কাপ্তাই ব্লাড ব্যাংকের উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক বিশেষ ক্যাম্পেইন জিম্মি নাবিকদের উদ্ধারে জাহাজের মালিকপক্ষের নতুন ঘোষণা
পর্তুগিজদের কাছ থেকে শুরু, ১৫৩ বছর পরও চট্টগ্রামের গণি বেকারির বেলা বিস্কুট সেরা!

পর্তুগিজদের কাছ থেকে শুরু, ১৫৩ বছর পরও চট্টগ্রামের গণি বেকারির বেলা বিস্কুট সেরা!

ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের সাথে বেলা বিস্কুট। ছবি- মেহজাবিন বশির তুলি

“ষাটের দশকের এক সন্ধ্যার কথা। আব্বা অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন অনেকগুলো বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে। প্যাকেটগুলো হাতে পেয়েই আমরা ভাই-বোন সবাই মিলে এমন আনন্দে মেতে উঠলাম, বাইরে থেকে দেখে যে কেউ ধারণা করে নেবে হয়তো খুব বড় কোনো উপহার পেয়ে গেছি। প্যাকেটগুলো নিয়ে আমাদের ভাইবোনের মধ্যে হতো কাড়াকাড়ি। আব্বাও আমাদের আনন্দ দেখে হাসেন। এরপর থেকে প্রায়ই তিনি সেই বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরতেন। আমরা সকাল-সন্ধ্যায় সেই বিস্কুট চায়ে ডুবিয়ে খেতে খেতে আড্ডা দিতাম। গণি বেকারির সাথে আমাদের পরিচয় হয় এভাবে। আব্বা বেঁচে নেই অনেক বছর হলো। কিন্তু তার নিয়ে আসা সেই বিস্কুটের প্রতি রেশ রয়ে গেছে এখনও। তাই যখনই চট্টগ্রাম যাই, কয়েক প্যাকেট বিস্কুট নিয়ে আসি এই বেকারি থেকে”, গণির বিস্কুট নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন নাজমীনা হক। মুখে তার স্মিত হাসি। হয়তো সেই সময়টার আরও অনেক স্মৃতি মাথায় এসে জড়ো হচ্ছে একে একে।

গণি বেকারি নিয়ে ২২ বছর বয়সী আজিজুর রহমান সোহেল তার জমানো স্মৃতি নিয়ে কথা বলছিলেন টিবিএসের সাথে। তিনি বলেন- “আমরা সাতকানিয়ায় থাকতাম আর আব্বু টেরিবাজারে চাকরি করতেন। প্রতি শুক্রবার বাড়ি আসার সময় তিনি গণি বেকারি থেকে বেলা বিস্কুট নিয়ে আসতেন। এক প্যাকেটে ৫০ পিস বিস্কুট থাকতো তখন। কাগজের প্যাকেটেই বিক্রি হতো সব পণ্য। আব্বুর নিয়ে আসা সেই বিস্কুট সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন দাদী এবং ফুফু। কিন্তু দাদী মারা যাওয়ার পর আব্বু এই বিস্কুট তেমন একটা নিয়ে আসেন না আর।”

গণি বেকারি।

মানুষের শৈশব-কৈশোরের অনেক গল্প এবং স্মৃতির সাথে সম্পৃক্ত এই বেকারি ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। যুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য খাবার হিসেবে রুটি নিয়ে আসা হতো এই ‘গণি বেকারি’ থেকেই। প্রতিদিন বিশাল সংখ্যক সৈন্যের জন্য রুটি তৈরি করতে হতো গণিকে। এত মানুষের জন্য যেসব কাঁচামাল দরকার হতো সেটি তখন ব্রিটিশরাই সরবরাহ করতো তাকে। সে সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত গণি বেকারি ক্রেতাদের নিকট এক আস্থার নাম।

বেলা বিস্কুট দিয়েই শুরু হয় যাত্রা

ষাটোর্ধ্ব আবদুল আজিজ (ছদ্মনাম)। গাড়ি থেকে নেমে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে প্রবেশ করলেন গণি বেকারির অন্দরে। দোকানের কর্মচারীদের বিনয়ের সাথে বাক্য বিনিময় এবং আন্তরিকতা দেখে যে কেউ আঁচ করতে পারবেন তিনি গণির পণ্যের অনেক পুরাতন ক্রেতা। একসাথে কিনে নিলেন ৩ প্যাকেট বেলা, ২ প্যাকেট টোস্ট, ২ প্যাকেট পাউরুটি। প্রতিবার অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এখান থেকেই নিয়ে যান নিজ পছন্দের পণ্য।

হরেক রকম বিস্কুটের দেখা মেলে এখানে।

শুধু আবদুল আজিজই নন, এই বেকারির অন্দরে বিস্কুট কেনার উদ্দেশ্যে আগমন ঘটে বিভিন্ন বয়সী ক্রেতার। ৩০ ধরণের পণ্যের মধ্যে ক্রেতাদের পছন্দের শীর্ষে আছে বেলা বিস্কুট। প্রায় ৩ ধরণের বেলা পাওয়া যায় এখানে। বেলা, মাখন বেলা এবং রোজ বেলা। এদের মধ্যে মাখন বেলার দাম সর্বাধিক। ৩০ পিস মাখন বেলার দাম রাখা হয় ১৫০ টাকা, সাধারণ বেলা এবং রোজ বেলার দাম ১১০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

শীতল হাওয়ার ভোরবেলাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে বেলা বিস্কুট ডুবিয়ে খাওয়া যেন এখানকার সব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে অন্যরকম প্রশান্তি। বর্তমানে বেলার সাথে যুক্ত হয়েছে মাখন বেলাও। চট্টগ্রামের মানুষের সাথে বেলা বিস্কুটের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।  কিন্তু এই বেলা বিস্কুট তৈরির যাত্রা শুরু হয় বেকারি প্রতিষ্ঠা হবার আরও আগে। ২০০ বছর আগে তৈরি হওয়া এই বিস্কুটকে বলা হয়ে থাকে উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন বিস্কুট। বছরের পর বছর চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করা এই বিস্কুট জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দেশের অন্যান্য স্থানেও। গবেষকদের তথ্যানুসারে  আবদুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার ও তাঁর ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে বেকারি পণ্য তৈরির সূচনা  হয় চট্টগ্রামে। সে সময়ে এই এলাকায় প্রবেশ ঘটে পর্তুগিজদের। তাদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ নানা বেকারি পণ্য। প্রচলিত রয়েছে পর্তুগিজদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই আবদুল গণি সওদাগর প্রথম বেলা বিস্কুটের প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। তাদের এমন খাদ্যাভ্যাসের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুরোদমে শুরু হয় বেকারিশিল্পের যাত্রা।

বেকারির অন্দর; ছবি।

ঐতিহ্যবাহী এই বেলা বিস্কুট এর গুণগান লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন লেখকের লেখনীতেও। কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার তার লেখা আঞ্চলিক এক ছড়ায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন এভাবে- 

“বেলা বিস্কুট গরম চা
মজা গরি ডুবাই খা
ঘরত গরবা আইস্যি
বেলা দেহি হাইস্যি।”

শুধু তাই নয়। ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল রচিত আত্মজীবনী রেখাচিত্র গ্রন্থে দেখা মেলে বেলা নিয়ে স্মৃতিচারণ। তিনি লেখেন- ‘ঘুম থেকে উঠে পান্তাভাতের বদলে খাচ্ছি গরম-গরম চা বেলা কি কুকিজ নামক বিস্কুট দিয়ে। কুকিজ ইংরেজি নাম, বেলা কিন্তু খাস চাটগেঁয়ে।’

গণি বেকারীর বর্তমান মালিক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম বলেন, “আমাদের পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো বেলা বিস্কুট । দিনে ২০০-২৫০ প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি হয় আমাদের।”

বেলার অন্যতম নতুন সংযোজন ‘মাখন বেলা’।

ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বেলা বিস্কুটের যোগান দিতে পারেন না অনেক সময়। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন বেকারির কেবল একটা শাখা হওয়ায় এই ঝামেলায় ভুগতে হয় তাদের। তাছাড়া বেলা বিস্কুট পুরোপুরি তৈরি করতে সময় লাগে ২ দিন। সময়সাপেক্ষ হওয়ার কারণেও যোগান বেশি দেওয়া সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি।

চার পুরুষের প্রজন্ম ধরে চলছে এই বেকারির কাজ

চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় এই বেকারির অবস্থান। বেকারির নাম অনুসারে এই এলাকায় একটি গলিও আছে। নাম ‘গণি বেকারী গলি’। চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রায় সব মানুষেরই এই বেকারি নিয়ে আছে ভালো জানাশোনা। ১৫৩ বছর ধরে সম্মানের সাথে পরিচালিত হওয়া চার পুরুষের এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কর্ণধার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম। বাবা জামাল উদ্দিনের কাছ থেকেই শিখে নেন বেকারির টুকটাক কাজ। জামাল উদ্দিন মারা যাওয়ার পর বেকারির এই গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি।

নব্বই দশকে যেমন ছিলো গণি বেকারির কাঠামো।ছবি-সৌজন্যে প্রাপ্ত

এই বেকারির পণ্যের ইতিহাস শুরু হয়েছিলো গণির পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার এবং তার ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে। কিন্তু তখনো গণি বেকারির এত নামডাক ছিলো না। ১৮৭০ সালের দিকে এই যাত্রায় নাম লেখান আবদুল গণি সওদাগর। নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘদিন পরিচালনা করেছেন এই বেকারির কার্যক্রম। ১৯৭০ সালে তিনি মারা যান। এই ঘটনার পর বেকারির দায়িত্ব নেন আবদুল গণির ভাইয়ের ছেলে দানু মিয়া সওদাগর। তার মৃত্যুর পরে জামাল উদ্দিন এবং পরবর্তীতে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশামের উপর অর্পিত হয় এই গুরুভার।

অতি প্রাচীন এই বেকারির নেই দ্বিতীয় কোনো শাখা। কেবল চট্টগ্রামের চন্দনপুরা এলাকায় কলেজ গলিতে ১৫৩ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত প্রধান শাখার দেখা মেলে। আর কোনো শাখা চালু করার ইচ্ছা আছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে এহতেশাম বলেন, “আমার বাবা করে গেছেন এই দোকান। এটাকে বাঁচিয়ে রাখা তো আমাদের দায়িত্ব। প্রফিট মেকিং নয়, শুধুমাত্র ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই দোকান এখনো চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। যদি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে করতাম তাহলে আজ এটার অনেক শাখা থাকতো।”

অনেকগুলো শাখা থাকার কুফলের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যান্য জায়গায় এই বেকারির একাধিক শাখা খুলতে গেলে আগের মতো ভালো পণ্য দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। এতে শাখা বৃদ্ধি পেলেও পণ্যের মান কমে যাবে। একটা শাখা হওয়াতে আগের স্বাদেই পণ্য দিতে পারেন বলেই পুরোনো ক্রেতারা এখনো ভিড় জমান এখানে। ক্রেতারা যে সন্তুষ্টির সাথে পণ্য ক্রয় করতে পারছে তখন হয়তো সেটা সম্ভব হতো না। এইসব চিন্তা মাথায় রেখেই দ্বিতীয় কোনো শাখা চালুর করার পরিকল্পনা কখনো কাজ করেনি বলে জানান তিনি।

বেকারির অন্দরে পাউরুটি, টোস্ট, চানাচুর, কুকিজ এবং খাস্তা বিস্কুটের সমাহার।

এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতেই তৈরি হয় বিস্কুট

ঐতিহ্যবাহী এই বেকারি এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতেই ভর করে টিকে আছে। ১৫০ বছর আগে যে চুলা ব্যবহার করে বিস্কুট তৈরি করা হতো এখনো সেই চুলাতেই তৈরি হয় বেকারির পণ্য।

আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে একাধিক মেশিনের চল এলেও প্রকৃত স্বাদ ও পণ্যের যথাযথ মান বজায় রাখতে এখনো বেকারির বিস্কুট তৈরি করা হয় ‘তন্দুরে’। মাটির তৈরি চুলাকে বলা হয় ‘তন্দুর’। বিস্কুট তৈরির পুরো পদ্ধতিজুড়ে যত পন্থা অবলম্বন করা হয় তার সবকিছুতেই আছে সেই প্রাচীন সময়কার ছাপ। ১৫ জন কর্মী অতি দক্ষতার সাথে করে যাচ্ছেন এই কাজ।

তবে এইজন্য বেশ দুর্ভোগও পোহাতে হয় বেকারির পরিচালককে। এহতেশাম বলেন, “১৮৭০ সালে বিস্কুট তৈরি করতে মাটির যে তন্দুরি চুলা ব্যবহার করা হতো সেটি বেশ পুরাতন হওয়ায় বারবার মাটির প্রলেপ লাগিয়ে ঠিক করতে হয় যা বেশ কষ্টসাধ্য একটা কাজ। মেশিন ব্যবহার করলে হয়তো এত কষ্ট হতো না। তবে মেশিনে পণ্যের স্বাদে ভিন্নতা তৈরি হয় বলেই এখনো তন্দুরেই ভরসা করা হয়।”

শুধু তাই নয়, বিস্কুট তৈরিতেও তাদের আছে নিজস্ব পদ্ধতি৷ যার ফলে অন্যান্য সব বেকারির চেয়ে এই বেকারির পণ্য একেবারেই আলাদা। সাধারণত বিস্কুট তৈরিতে ইস্ট ব্যবহৃত হলেও এখানে সেটা করা হয় না। ইস্টের পরিবর্তে ‘মাওয়া’ নামের একটি মিশ্রণ ব্যবহার করা হয় যা তাদের গোপন তরিকা হিসেবেও সমাদৃত। এই কারণে বিস্কুটের স্বাদেও তৈরি হয় ভিন্নতা।

ভিন্ন স্বাদের বাকরখানি

এই বেকারির আরও একটি উল্লেখযোগ্য পণ্য হলো বাকরখানি। সাধারণ বাকরখানির মত নয় এটি। স্বাদে অনন্য এই বাকরখানি খাওয়া হয় মাংসের ঝোল বা মাংস দিয়ে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর মধ্যে এটিও একটি। ঈদ-উল-আজহায় গরুর মাংস ভুনার সাথে বাকরখানির দিয়ে মেহমান আপ্যায়ন করা হয় প্রায় প্রতিটি ঘরে। এমনকি ঈদের আগে এই বাকরখানির জন্য পূর্বেই অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। দুই ধরণের বাকরখানি আছে এই বেকারিতে। একটি শুকনো বাকরখানি, অন্যটি চিনির শিরাযুক্ত রসালো বাকরখানি। মাংসের সাথে এই বাকরখানির সংমিশ্রণ স্বাদে নিয়ে আসে অন্যরকম বৈচিত্র্য।

বৈচিত্র্যময় এই বাকরখানির দেখা মেলে কেবল চট্টগ্রামে। বাকরখানির কথা আসলেই সবার চোখের সামনে ভেসে উঠে পুরান ঢাকার মুচমুচে নোনতা  বাকরখানির কথা। কিন্তু গণির বাকরখানি খেতে এমন শুকনো বা নোনতা স্বাদের হয় না। অত্যন্ত রসালো এবং সুমিষ্ট চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই বাকরখানি ছেলেবুড়ো সবারই অন্যতম পছন্দের খাবার।

এহতেশাম বলেন, “দেখা যায় এতই অর্ডার আসে সে অনুযায়ী সাপ্লাই দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। মাত্র ১৫ জন কর্মী নিয়ে আমার এই বেকারি। এইজন্য অনেকেই আগে থেকে বলে রাখেন কত পিস বাকরখানি তার লাগবে। কেউ কেউ পূর্বেই ২০০, ৩০০ পিস অর্ডার দিয়ে রাখেন।”

গণি বেকারির টোস্ট বিস্কুট।

আগের ক্রেতারাই বেশি ভিড় করেন

শতাব্দী প্রাচীন এই বেকারির সাথে ক্রেতাদের রয়েছে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। শুরুর দিকে যেসব ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছিলো এই বেকারির পণ্য, সেসব ক্রেতারাই এখনো এসে ভিড় করেন এখানে৷ ক্রেতাদের এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বংশপরম্পরায় সম্পৃক্ত ক্রেতাও। এমনই একজন ক্রেতা হলেন আসমা আক্তার। তার বাবা এই বেকারি থেকে পণ্য নিয়ে আসতেন নিয়মিত। এরই ধারাবাহিকতায় তিনিও নিয়ম করে এখান থেকেই পণ্য কিনে নিয়ে যান।

তিনি বলেন, “বাবার সময় থেকেই এই বেকারিকে চিনি আমরা। তখন থেকেই একটা বিশ্বাস তৈরি হয়েছে এই বেকারির প্রতি। অবশ্য তারা সে বিশ্বাসটা অর্জনও করতে পেরেছে। তাই প্রতিবার এখান থেকেই পাউরুটি, টোস্ট, চানাচুর এইসব কিনে নিই।”

এই বিষয়ে এহতেশাম বলেন, “যারা আগে থেকে  আমাদের ক্রেতা ছিলো তারাই বারবার কেনে। দেখা যায় তাদের দেখাদেখিতে তাদের ছেলেমেয়ে এই বেকারি থেকে কেনার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।”

গণির ‘সিগনেচার প্রোডাক্ট’ বেলা।

চট্টগ্রামের কাঠগড়ে বসবাসরত এক ক্রেতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এই ক্রেতা দুই প্যাকেট বিস্কুট ২২০ টাকা দিয়ে কিনতে গাড়ি ভাড়া খরচ করেন ৫০০ টাকারও বেশি। প্রতিবার এই দূরত্ব অতিক্রম করে তিনি গণি থেকেই  বিস্কুট কিনে নেন ছেলেমেয়েদের জন্য।

এহতেশাম বলেন, “এই ক্রেতাদের জন্যই গণি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তারা আমাদের উপর বিশ্বাস রেখেছে আর আমরা চেষ্টা করে যাই সে বিশ্বাসের জায়গা যাতে নষ্ট না হয়।”

লাভ-লোকসানের হিসেব নয়, কেবল বেকারির ঐতিহ্য এবং বেকারির সাথে সম্পৃক্ত বংশপরিচিতি ধরে রাখতে এখনো পণ্য তৈরি করার কাজ অব্যাহত রেখেছেন তারা। একটাই লক্ষ্য তাদের সামনে, তা হলো যে সুনাম তৈরি করে গেছেন গণি সওদাগর সেটি টিকিয়ে রাখা। এই কারণে পূর্বপুরুষরা পণ্যের মানের যে মানদণ্ড বা ঐতিহ্য সৃষ্টি করে গেছেন সেটায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ বর্তমান কর্ণধার এহতেশাম।

তিনি বলেন, “আমার দাদা-বাবার যত্নে করা যে বেকারি বিশাল সংখ্যক মানুষের আস্থার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে তার পণ্যের মানের সাথে কম্প্রোমাইজ করা মানে হলো নিজের সাথেই অন্যায় করা।”

Please Share This Post in Your Social Media

Powered by : Oline IT